হালালার নামে ইদ্দত বাদ দিয়ে নতুন বিয়ে—ফিকহী দৃষ্টিতে গুরুতর গোনাহ
মুহতারাম মুফতি সাহেব, হুজুর বিস্তারিত ঘটনা দিলাম।
প্রায় আড়াই বছর আগেই আমার এক সাথেই তিন তালাক হয়ে গেছে ভুল করে হলেও। তারপর স্ত্রী বলে কি ভুলটাই না করলা এটা। তখন আমরা ইউটিউব এ বিভিন্ন আলেমের বিভিন্ন তালাক এর ভিডিও দেখি অনেকে বলে যতোই তালাক দিক এক হায়েজে হবে একটি তালাক। সবাই বলে এটা তিন হয়নি একটা হয়েছে বিভিন্ন আলেমের ইউটিউবের ভিডিও থেকে দেখে। পরে আমিও একটা তালাক হয়েছে ধরে নিয়ে সংসার করতে থাকি। কিন্তু প্রায় দুই বছর একসাথে থাকার পরেও আমার মনে হল যে এভাবে থাকা আমার ঠিক হচ্ছে না। এটা সম্পূর্ণ জেনা হচ্ছে কারণ তালাক তিনটাই হয়েছে। এটা আমার স্ত্রী কেউ বলি যে তালাক তিনটাই হয়ে গেছে। আমি যেহেতু হানাফী মাযহাবের। তখন ও মানতে চায় না কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটুট যে তালাক তিনটে হয়ে গেছে আমি ওকে বলেও দিয়েছি ওর বাড়িতেও জানিয়েছি। কিন্তু মুরুব্বিরা মানতে চায় না বোঝেনি তো গ্রামের মুরুব্বী।
স্ত্রীকে ১৫ দিনের জন্য ওর বাবারা ওদের বাসায় নিয়ে যায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার জন্য ততদিন বেড়াবে এই বলে। এরপর আবার মুরুব্বীরা আমাকে বুঝাতে থাকে যে একসাথে দিলে একটাই তালাক হয়েছে, তিন তালাক হয়নি। পরে পরিবারের কথায় আবার ওকে নিয়ে আসি ১৫ দিনের দিন। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটুট যে তিনটাই হয়ে গেছে। কিন্তু মুরব্বিদের ও বউকে কোনো মতেই বোঝাতে পারিনা যে আমাদের তিন তালাক ই হয়ে গেছে।
কি করা যায়! পরে আমি বুদ্ধি করি এই বউয়ের কাছ থেকে বাঁচার জন্য একটা উপায় বের করলাম। ওর সাথে সবসময় খারাপ ব্যবহার করতে হবে যা মানুষিক অশান্তি। বউয়ের মতো কোনো রকম ব্যবহার দেখায়নি শুধু সন্তানের মায়ের মতো সন্তানের কি লাগবে না লাগবে এগুলো। এগুলো করি যেন নিজে থেকে চলে যায়। দুই পরিবারের চাপের মুখে আমি হারাম মনে করেই থাকতে লাগলাম সুযোগের অপেক্ষায়। এভাবে ছয় সাত মাস মানুষিক টর্চার চলতে থাকে কিন্তু যায় না আর আমি বলি যে তিনটাই হয়ে গেছে তিনটাই হয়ে গেছে। তোমার সাথে জেনা করবো না তুমি চলে যাও। এই ছয় সাত মাসের মধ্যে ওকে আমি বিভিন্নভাবে পর্দা করতেও বলেছি আজ আমি তোমার পর পুরুষ ।
নোট করুন: কিন্তু ওই স্ত্রী কোনো সময়ই এটা মানতে চায় না যে আমাদের মাঝে তিন তালাক হয়ে গেছে। সে শুধু একটা তিন এ একটা হয়েছে মনে করে এবং এইভাবেই সংসার করতে চায়। ওই আমার অন্য কিছু হয়েছে বলে পানি পড়া ঝাড়ফুক ও একসাথে মিলানোর জন্য বিভিন্ন আমল ও করতো। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত এ অটুট।
আমার সম্পূর্ণ নিয়ত ছিল যে তাকে আমি আর রাখবো না আমার তিনটি তালাক হয়ে গেছে এবং যেনাই হচ্ছে জেনা (মূল কথা দুই আড়াই বছর আগে যখন একসাথে তিন তালাক দিয়েছিলাম, তখন বিভিন্ন জায়গায় থেকে শুনি যে এটা তিনটি নয় একটি তালাক হয়েছে সেই হিসাবে যদিও মনে একটু একটু সন্দেহ ছিলো তাও আমরা সংসার করতে থাকি)
তারপর আর সাহস পেলাম না সংসার করতে পরে তাকে জানিয়ে দেয় তালাক তিন তালাকই হয়েছে তাই আর সংসার করা সম্ভব নয়। আমাদের আলাদা হয়ে যেতে হবে কিন্তু সে এবং ওর পরিবার আর আমার পরিবার তিন তালাক হয়নি বলে মিলেয়ে দেয় কিন্তু আমার সিদ্ধান্তে আমি অটুট থাকি আর ওকে বিভিন্নভাবে বাড়ী ছাড়ানোর পরিকল্পনা করি বাকি ছয় সাত মাস থেকে। (তবে এই ছয় সাত মাসে আমাদের কয়েকবার সহবাস হয় হারাম জেনা মনে করে)
এই ছয় সাত মাসে আমি নিজে থেকে ওর কাছে যাইনি ওই কয়েকবার জোরজবস্তি আশাতেই হয়েছে তাও আমি যেনা মনে করেই করেছি আর ওকেও বলেছি জেনা হচ্ছে আর এই জেনা থেকে বাঁচতে হলে একটাই রাস্তা হয় চলে যাও নাই না হিল্লা করো। পরে মানুষিক টর্চার সহ্য করতে না পেরে বলে কি করলে তুমি খুশি হবা আমাকে মেনে নেবা। তখন বলি হিল্লা বিবাহ করতে। তখন সে পরে হিল্লা বিবাহ করতে রাজি হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমার থেকে তখন আর ইদ্দত পালন না করে ই হিল্লা বিয়ে করে নেয়। এমনকি হিলা বিয়ের কয়েকদিন আগেও আমাদের সহবাস হয়, তাও নিশ্চিত হারাম বা জেনা মনে করেই।
ইদ্দত পালন করা হয়নি কারণ ছয় সাত মাস থেকে তালাক হয়ে গেছে ধরে নিয়ে জেনে শুনে হারাম সংসার সহবাস করেছি তাই মনে করে ।
মোট কথা: আমার তালাকের নির্দিষ্ট কোনো ইদ্দত পালন করেনি নির্দিষ্ট কোনো সময় এ ।
পশ্ন: তাহলে এই হিল্লা বিয়ে কি সহি হয়েছে?
আর হিল্লা বিয়ে সহি হলে কেন সহি হবে?
আবার সহি না হলে কেন সহিহ হবে না যদি বিস্তারিত জানাতেন? কেননা পরবর্তীতে সব নিয়ম মেনে আমি আবারো ওই স্ত্রীকে বিয়ে করেছি এবং প্রায় এক বছরের বেশি সময় চলছে এখন। আমরা কি এখন বৈধ আছি?
সব কথার মুল কথা আমার তালাকের ইদ্দত কি কোনো প্রকার পালন হয়েছে। অন্তরের পেরেশানিটা কমতো।
নিবেদক,
রাশেদ-সিলেট
الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب
ইসলামে শরিয়া মতে তালাক দেওয়ার অধিকার একমাত্র স্বামীর। তাই তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে স্বামীর কথায় ধর্তব্য হয়। আর ইদ্দতের গণনা শুরু হয় তালাক পরবর্তী সময় থেকেই। যিনাকারী মহিলার বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ইদ্দত পালন করা আবশ্যক নয়।
সুতরাং উপরোল্লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী তালাকের সংখ্যা নিয়ে আপনাদের মাঝের মতবিরোধের ব্যাপারে আপনার কথায় ধর্তব্য হবে তথা তিন তালাক পতিত হয়েছে। আর আপনাদের মাঝে তিন তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ পরবর্তী একত্রে থাকা ও সহবাস করা শরীয়তে ইসলামিয়াতে তা যিনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিধায় আপনার স্ত্রী যিনাকারী অবস্থাতে অন্যত্রে হিলা বিবাহের জন্য ইদ্দত পালন ব্যতিত বিবাহ করায় সেই বিবাহ বৈধ বিবাহ হয়েছে। আর এখন সেই স্বামীর থেকে তালাক প্রাপ্তা হয়ে ইদ্দত পারন পরবর্তী শরীয়ত সম্মত আপনি বিবাহ করায় তা বৈধ বিবাহ বলে গণ্য হবে। তাই আপনি এখন নির্দিধায় ঘর-সংসার করুন।
উল্লেখ্য: শরীয়তে ইসলামিয়াতে ইদ্দতের গণনা শুরু হয় তালাক পরবর্তী সময় থেকেই। তাই আপনার প্রশ্নের বর্ণনা মতে তালাক পরবর্তী সাত মাস যে একসাথে থেকেছেন তন্মধ্য থেকে প্রথম তিন মাসই ইদ্দত পালন হিসেবে গণনা করা হবে। বিধায় ইদ্দত অতিবাহিত পরবর্তী নতুন করে ইদ্দত পালন করার কোন সুযোগ নেই।
الادلة الشرعية
(سورة البقرة: 235)
وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّىٰ يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ
(الفتاوى الهندية، -1/280)
لا يجوز للرجل أن يتزوج زوجة غيره، وكذالك المعتدة سواء كانت العدة عن طالق، أو وفاة
(رد المحتار-4/274)
أَمَّا نِكَاحُ مَنْكُوحَةِ الْغَيْرِ وَمُعْتَدَّتِهِ فَالدُّخُولُ فِيهِ لَا يُوجِبُ الْعِدَّةَ إنْ عُلِمَ أَنَّهَا لِلْغَيْرِ لِأَنَّهُ لَمْ يَقُلْ أَحَدٌ بِجَوَازِهِ فَلَمْ يَنْعَقِدْ أَصْلًا
(بدائع الصنائع-2/549)
ومنها ان لا تكون معتدة الغير لقوله: ولا تعزموا عقدة النكاح حتى يبلغ الكتاب أجله أى ما كتب عليها من التربص
و الله اعلم بالصواب
كتبه
المجلس المشترك للإفتاء
بمعهد الفقه الاسلامي داكا. بنغلاديش