স্ত্রীর চাপের মুখে তালাক দিয়েছি এবং আমার অন্তরে ইচ্ছা ছিল না, জোড় পূর্বক তালাক প্রদান করলে কার্যকর হওয়া প্রসঙ্গে
মুহতারাম মুফতি সাহেব, আমি আমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে [১২ জুলাই ২০২৪] তারিখে বিবাহ করি। বিয়ের সময় আমার পক্ষ থেকে দু’জন সাক্ষী এবং স্ত্রীর পক্ষ থেকেও দু’জন সাক্ষী ছিল, শুধু কবুল বলে মোহরানা ধার্য করে ইজাব কবুল করে আমরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই। কোনো লিখিত নিকাহনামা হয়নি। আমার স্ত্রীর পরিবার এই বিয়ের কথা জানেনা। কথা ছিল পরিবারকে জানিয়ে পরে আবার আমরা বিয়ে করব।
আমার প্রথম সংসারে দুই সন্তান আছে, যারা তাদের মায়ের কাছেই থাকে। দ্বিতীয় স্ত্রীকে প্রথমে কথা দিয়েছিলাম আমার সন্তানরা তাদের মায়ের কাছেই থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় তাদেরকে দ্বিতীয় স্ত্রীকে রাখতে বলি কিন্তু তিনি আমার সন্তানদের রাখতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাই পরবর্তীতে আমি তৃতীয় বিয়ে করি, তবে তৃতীয় স্ত্রীর পরিবারের কাছে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখি।
তৃতীয় স্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা দ্বিতীয় স্ত্রীর ব্যাপারটি জেনে আমার উপর প্রচÐ চাপ সৃষ্টি করে এবং আমাকে দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিতে বাধ্য করে। সেই চাপের মুখে পড়ে আমি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে বলি:
“সবার সম্মতিতে তোমাকে এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক দিলাম।” এভাবে উচ্চারণ করি। তার পূর্বে আর কোনো তালাক প্রদান করা হয়নি। কিন্তু আমার অন্তরে প্রকৃতপক্ষে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। মনে মনে আমি শুধু এক তালাকের নিয়ত করেছিলাম, কিন্তু মুখে তিন তালাক উচ্চারণ করেছি কেবল চাপের কারণে। বর্তমানে আমি বিষয়টি নিয়ে খুব অনুতপ্ত, লজ্জিত, আল্লাহর কাছে বারবার তাওবা করছি। এবং আমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে কিছুতেই ভুলতে পারছি না। তাকে ছাড়া থাকা অসম্ভব আমার জন্য। তালাক উচ্চারণের পর তিনি ইদ্দতের মধ্যে ছিলেন, কিন্তু ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই আমাদের মাঝে সহবাস হয়েছে। আমার ধারণা ছিল এটি তালাক রুজু করে দিবে। কোনো লিখিত তালাকনামাও হয়নি, শুধু মৌখিকভাবে এই একবারই তিন তালাক উচ্চারণ করেছিলাম।
বর্তমানে আমি আমার বাসায় (কলাপাড়া, কিশোরগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জ ) অবস্থান করছি এবং আমার স্ত্রী তার বাবার বাড়িতে ( ইটনা , কিশোরগঞ্জ) অবস্থান করছেন।
আমার প্রশ্নসমূহ:
১. যেহেতু আমি চাপের মুখে তালাক দিয়েছি এবং আমার অন্তরে ইচ্ছা ছিল না, তাহলে শরিয়াহ অনুযায়ী এই তালাক কি কার্যকর হয়েছে?
২. আমি একসাথে তিন তালাক উচ্চারণ করলেও, যেহেতু ইদ্দতের মধ্যে আমরা সহবাস করেছি, তাহলে কি আমাদের বিবাহ সম্পর্ক বহাল আছে?
৩. এই তালাক কি তিন তালাক হিসেবে গণ্য হবে, নাকি এক তালাক হিসেবে গণ্য হবে?
৪. আমাদের জন্য পুনরায় একসাথে থাকা বৈধ হবে কি না?
আমি একজন মুসলিম স্বামী হিসেবে কুরআন-সুন্নাহ আলোকে সঠিক বিধান বুঝে আমার দাম্পত্য সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে চাই। সম্মানিত শায়েখ/আলেমগণ যদি কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে আমাকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, তবে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
নিবেদক,
আবুল ফজল- কিশোরগঞ্জ
الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب
ইসলামিক শরিয়াহ মোতাবেক জীবননাশ বা অঙ্গহানির প্রকৃত ভয় না থাকে, কেবল পারিবারিক বা সামাজিক চাপ হয়, এমতাবস্থায় তালাক দিলে তা কার্যকর হয়। গ্রহণযোগ্য মতানুসারে একসাথে তিন তালাক উচ্চারণ করলে তিন তালাকই কার্যকর হয়। একসাথে তিন তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতের মধ্যে সহবাস করলে তা রুজু হয় না বরং জিনা ব্যাভিচার হিসেবে গণ্য হয়। আর তিন তালাকের পর তালাকপ্রাপ্তা মহিলা স্বাভাবিকভাবে অন্যত্র বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার পর স্বামী মারা গেলে বা তালাক দিলে ইদ্দত পালনের মাধ্যমে প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহে আবদ্ধ হতে পারবে। অন্যথায় নয়।
সুতরাং আপনার বর্ণনা অনুযায়ী পারিবারিক চাপ বা সামাজিক চাপে তালাক বলায় এক তালাকের নিয়ত থাকা সত্বেও তিন তালাকই পতিত হবে। এবং একসাথে তিন তালাক উচ্চারণের কারণে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তিন তালাকই সংগঠিত হয়েছে। আর তিন তালাক হওয়ায় ইদ্দত চলাকালীন সময়ে সহবাসের মাধ্যমে কোনো রুজু কার্যকর হয়নি। বরং তা জিনা ব্যাভিচার হয়েছে।
তিন তালাকের পর যেহেতু আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে একে অপরের জন্য হারাম হয়ে গেছেন বিধায় একসাথে সংসার করা আপনাদের জন্য বৈধ নয়। তবে তালাকপ্রাপ্তার স্বাভাবিকভাবে অন্যত্র বিবাহ হলে এবং পরবর্তীতে স্বামী তালাক দিলে বা মারা গেলে ইচ্ছা থাকলে ইদ্দতের মাধ্যমে পুনরায় বিবাহে আবদ্ধ হতে পারবেন। অন্যথায় নয়।
الادلة الشرعية
(البقرة: ٢٣٠)
﴿فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ﴾
(الفتاوى الهندية، ١/٤٨٦)
إِذَا طَلَّقَهَا تَطْلِيقَةً أَوْ تَطْلِيقَتَيْنِ رَجْعِيَّتَيْنِ ثُمَّ وَقَعَ بَيْنَهُمَا جِمَاعٌ فِي الْعِدَّةِ يَكُونُ ذَلِكَ رُجُوعًا، أَمَّا إذَا كَانَ الطَّلَاقُ ثَلَاثًا فَلَا يَكُونُ الْجِمَاعُ رُجُوعًا بَلْ يَكُونُ زِنًى
(بدائع الصنائع، ٣/١٠٠)
إِذَا قَالَ لِامْرَأَتِهِ: أَنْتِ طَالِقٌ ثَلَاثًا، وَإِنَّمَا نَوَى وَاحِدَةً، لَزِمَتْهُ الثَّلَاثُ؛ لِأَنَّ كَلَامَهُ صَرِيحٌ فِي الثَّلَاثِ، فَلَا عِبْرَةَ لِلنِّيَّةِ فِيهِ
(رد المحتار على الدر المختار، ٣/٢٤٦)
قَوْلُهُ (وَلا يُعْتَبَرُ فِي الطَّلَاقِ وَالنِّكَاحِ إلَّا الإكْرَاهُ التَّامُّ) وَهُوَ مَا يُوجِبُ الْخَوْفَ عَلَى النَّفْسِ أَوْ عَلَى عُضْوٍ مِنْ أَعْضَاءِ الْبَدَنِ، أَمَّا غَيْرُهُ مِنْ إلْجَاءِ الْوَالِدَيْنِ أَوْ الْأَقَارِبِ فَلَا يُعْتَبَرُ إكْرَاهًا
(الفتاوى الهندية، ١/٣٧٦)
"وَلَوْ قَالَ: أَنْتِ طَالِقٌ ثَلَاثًا، وَنَوَى وَاحِدَةً، تَقَعُ الثَّلَاثُ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ وَصَاحِبَيْهِ."
و الله اعلم بالصواب
كتبه
المجلس المشترك للإفتاء
بمعهد الفقه الاسلامي داكا. بنغلاديش