ফিকহ তালাক

তিন তালাকের পর প্রথম স্বামীকে না জানিয়ে গোপনে হালালা করে আসলে প্রথম স্বামী বৈধ হয়ে যায়



         মুহতারাম মুফতি সাহেব, নারী প্রথম স্বামী থেকে তিন তালাক প্রাপ্ত হয় তারপর ইদ্দত পালন শেষ করে। তালাকের কথা সে শুধু তার বাবা মাকে জানিয়েছিল। সামাজিক লজ্জার ভয়ে তালাকের কথা সামনে আনতে পারেনি। তারপর সে তার বাবার অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে। দ্বিতীয় বিয়েতে বাবা উপস্থিত ছিলো না তবে সে তার বাবাকে বলেছিল সে দ্বিতীয় বিয়ে করবে এবং বাবা অনুমতি দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিয়েতে কোনো লিখিত কাবিন ছিলো না। হুজুর ডেকে দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর সামনে মোহর ধার্য করে বিয়ে হয়।

আরেকটি বিষয় হলো দ্বিতীয় বিয়ে যাকে করেছিলেন সেই লোক এই নারীর আত্মীয় হোন পারিবারিক ভাবে (অবশ্যই নন মাহরাম)। যেহেতু নারী তার প্রথম তালাকের কথা সামাজিক ভাবে সামনে আনেনি তাই দ্বিতীয় স্বামীও জানতেন না এই নারী তালাক প্রাপ্ত হয়েছে। দ্বিতীয় স্বামী বিয়ের পূর্বে জানতেন এই নারীর প্রথম স্বামী বহাল আছে তবুও তিনি বিয়ে করেছেন কারণ তিনি এই নারীর প্রতি দূর্বল ছিলেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাস হয় একবার। তারপর নারী দ্বিতীয় স্বামীকে জানিয়ে দেয় সে তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে প্রথম স্বামী থেকে দ্বিতীয় বিয়ের পূর্বেই। তারপর সে দ্বিতীয় স্বামীকে অনুরোধ করে তালাক এর জন্য। সে দ্বিতীয় স্বামীকে যা বলেছিল তা তুলে ধরা হলো "আমি আপনার বৈধ স্ত্রী। আপনাকে জোর করে আমি তালাক আদায় করতে চাইনা কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবাসি না, আমি প্রথম স্বামীকে ভালোবাসি। আমি শুধু আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি যদি দয়া করে আমাকে তালাক দিয়ে মুক্ত করে দেন তাহলে আমি আমার বাচ্চার বাবার কাছে ফিরে যেতে পারবো, আমার বাচ্চা তার বাবার আদর পাবে"

দ্বিতীয় স্বামী তখন জানতে চায় কিভাবে তালাক চায় নারী। নারী তখন তিন তালাক চায় আর দ্বিতীয় স্বামী রাজি হয় এবং তিনি একসাথে তিন তালাক বলেন। নারী তখন স্বেচ্ছায় তার মোহরের দাবি ছেড়ে দেয়।

উল্লেখ: দ্বিতীয় স্বামীর সাথে বিয়ের সময় শর্ত দেওয়া হয়নি যে বিয়ের পরে তালাক দিতে হবে। শর্তহীন এবং চুক্তিহীন বিয়ে ছিলো দ্বিতীয় বিয়ে। কিন্তু নারীর অন্তরে সবসময় ছিলো সে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরবে।

আর এই দ্বিতীয় বিয়ের কিছুতে প্রথম স্বামী ছিলো না। অর্থাৎ কখন দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে,কার সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে এবং কখন তালাক হয়েছে এগুলো প্রথম স্বামী জানতেন না। নারী যা করেছে স্বেচ্ছায় করেছে। সে শুধু প্রথম স্বামীকে বলেছিল যদি কখনো ফেরার সুযোগ হয় তাহলে সে ফিরবে, যদি তার জন্য অপেক্ষা করতে পারে তাহলে অপেক্ষা করতে।

জবাবে প্রথম স্বামী বলেছিল সে অপেক্ষা করবে কিন্তু তাকে কোনো কিছুতে জড়ানো যাবেনা অর্থাৎ সে এইসব কোনো কিছুর মধ্যে নেই।

দ্বিতীয় স্বামী থেকে তালাক প্রাপ্ত হওয়ার পর নারী তিন হায়েয ইদ্দত পালন করে।

 

এখন প্রশ্ন হলো:-

১. দ্বিতীয় বিয়ে এবং তালাক সহীহ হয়েছিল?

২. নারী কি প্রথম স্বামীর কাছে ফিরতে পারবে?

৩. নারী দ্বিতীয় বিয়েতে মুখে কিছু উচ্চারণ না করলেও তার অন্তরে তো ছিলো সে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরবে, তার অন্তরের এই ভাবনার জন্য কি প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহে নাজায়েজ কিছু হবে?

 

 

নিবেদক,

মোছা: আয়েশা সিদ্দিকা-উত্তরা, ঢাকা




الجواب باسم ملهم الصِّدق و الصّواب

 

ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর উপর তিন তালাক পতিত হলে সেই স্বামীর জন্য স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যায়, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীর সাথে সহীহ বিবাহ ও সহবাস করে এবং পরবর্তীতে বৈধভাবে তালাকপ্রাপ্ত হয় বা স্বামীর মৃত্যু ঘটে এবং ইদ্দত শেষ হয়; তখনই পুনরায় আগের স্বামীকে বিয়ে করা বৈধ হয়।

সুতরাং, প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী নারী প্রথম স্বামী থেকে তিন তালাকপ্রাপ্তা হয়েছিল এবং ইদ্দতও শেষ করেছিল, তাই দ্বিতীয় বিয়ে সহীহ হয়েছে। আর দ্বিতীয় বিয়েতে বাবা উপস্থিত না থাকলেও হানাফি মাজহাব অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজের বিয়ে নিজেই শরয়ী সাক্ষীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন করেছে, তাই তাতে কোনো অসুবিধা নেই।

অতঃপর দ্বিতীয় স্বামীর একসাথে তিন তালাক দেয়া বাইনে মুগল্লাজা হিসেবে পতিত হয়েছে, তাই সেই তালাকও সহীহ হয়েছে। সুতরাং, ইদ্দত শেষে এখন প্রথম স্বামীর সাথে নতুন করে বিয়ে করায় তা বৈধ হবে।

উল্লেখ্য, অন্তরের গোপন ইচ্ছা যে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরবে এটি বিয়েকে ফাসিদ বা বাতিল করে না, যেহেতু বিয়েতে কোনো শর্ত হিসেবে সেটি ঘোষণা করা হয়নি। তাই পুনরায় প্রথম স্বামীর সাথে বিয়ে করায় কোনো শরয়ি বাধা নেই।

 

 

الادلة الشرعية

القرآن: سورة البقرة، الآية: 230

             فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ     

(سورة البقرة: 235)

  وَلَا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي أَنْفُسِكُمْ فَاحْذَرُوهُ      

(صحيح البخاري، الرقم: 2639)

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:          

«لَا يَحِلُّ لَهَا أَنْ تَرْجِعَ إِلَى زَوْجِهَا حَتَّى تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ وَيَذُوقَ عَسِيلَهَا وَهُوَ يَذُوقُ عَسِيلَهَا          

الدر المختار ٣/٥٢

«لا يتم العقد قبل انقضاء العدة، فإن انقضت العدة جاز العقد         

(رد المحتار: 3/55، دار الفكر)

               "إذا زوجت البالغة نفسها من كفء بشهادة رجلين مسلمين جاز، وإن كره الأولياء."         

بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع ٣/١٠٠، ٣/٤٥٨:

«العبرة في العقود للحقائق والمعاني لا للألفاظ والمباني                                           

الدر المختار وحاشية ابن عابدين، ٣/٥٥٢

التطليق الثلاثة مجتمعة بلفظ واحد أو ثلاث كلمات صريحة، فهو طلاق بائن بينونة كبرى

 

و الله اعلم بالصواب

كتبه                 

المجلس المشترك للإفتاء   

بمعهد الفقه الاسلامي داكا. بنغلاديش




 

০৪ নভেম্বর ২০২৫