’’সহিহ ফাতওয়া মাসাঈল জানতে সঠিক লোকের দ্বারস্থ হোন ‘’ মুফতি আবু সাঈদ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ
মানুষের জীবনে ধর্মীয় নির্দেশনা মেনে চলা একান্ত জরুরি। ইসলাম কেবল নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আচার-আচরণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পারিবারিক সম্পর্ক থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক পথনির্দেশ দিয়েছে। এই পথনির্দেশের অন্যতম প্রধান অংশ হলো শরীয়াহভিত্তিক ফাতওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যখন কোনো জটিল মাসআলা বা দ্বীনি সমস্যা সামনে আসে, তখন আমরা কার কাছে যাব? কাকে অনুসরণ করব?
আজকের যুগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তথ্যের সহজলভ্যতা। ইন্টারনেট, ইউটিউব কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য ব্যক্তি নানা ধরণের বক্তব্য পেশ করছে। অনেকেই নিজেদেরকে আলেম বা গবেষক দাবি করছে। কিন্তু সবাই কি সত্যিকার অর্থে যোগ্য? না হলে এর ফলাফল কী হতে পারে? তাই ইসলাম আমাদেরকে সতর্ক করেছে—ফাতওয়া বা মাসআলা জানার জন্য অবশ্যই যোগ্য, বিশ্বস্ত ও আল্লাহভীরু আলেমদের দ্বারস্থ হতে হবে।
ফাতওয়া কী এবং এর গুরুত্ব
“ফাতওয়া” শব্দটির অর্থ হলো প্রশ্নের জবাব বা সমাধান। ইসলামী শরীয়াহর আলোকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে একজন যোগ্য আলেম বা মুফতী যে সিদ্ধান্ত দেন, তাকেই ফাতওয়া বলা হয়। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সঠিক ফাতওয়া মানুষের জন্য দিশারী।
কোনো বিষয়ে ভুল ফাতওয়া গ্রহণ করলে মানুষ আল্লাহর নাফরমানীতে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন—যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়া ফাতওয়া দেয়, সে গুনাহগার হয় এবং তার ভুলের বোঝাও তার ওপর বর্তাবে। (আবু দাউদ, হাদীস ৩৬৫৭)
অযোগ্য লোকের কাছে ফাতওয়া নেওয়ার ক্ষতি
আজকাল আমরা দেখি—কেউ এক-দু’টি বই পড়ে বা কিছু ভিডিও দেখে “আলেম” সাজার চেষ্টা করছে। কেউ আবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, কেউ জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য, আবার কেউ আর্থিক সুবিধার জন্য সাধারণ মানুষের সামনে বক্তব্য দিচ্ছে। অনেক সময় তারা হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল বলে বসে। এর ফলে মুসলমান সমাজ বিভ্রান্ত হয়।
একজন অজ্ঞ ব্যক্তির কাছ থেকে ফাতওয়া নিলে কয়েকটি ক্ষতি হতে পারে—
-
আকীদা ও আমল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা: ভুল নির্দেশনার কারণে মানুষ শিরক, বিদআত বা গুনাহে লিপ্ত হতে পারে।
-
সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়: সঠিক ইসলামী শিক্ষার পরিবর্তে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন মতের কারণে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
-
দ্বীনের ভুল চিত্র উপস্থাপিত হয়: অযোগ্য লোকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো ধর্মের ব্যাখ্যা দেয়, ফলে অমুসলিমদের কাছে ইসলাম বিকৃত রূপে উপস্থাপিত হয়।
কাদের কাছ থেকে ফাতওয়া নিতে হবে
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেনঃ
“তোমরা যদি না জান, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর।” (সূরা নাহল, আয়াত ৪৩)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দ্বীনি মাসআলা জানার জন্য অবশ্যই যোগ্য আলেমদের দ্বারস্থ হতে হবে। কিন্তু যোগ্য আলেম কারা?
যোগ্য আলেম বা মুফতির কিছু বৈশিষ্ট্যঃ
-
কোরআন ও সুন্নাহতে গভীর জ্ঞান: তিনি প্রামাণ্য সূত্রসমূহ ভালোভাবে জানেন।
-
ফিকহে পারদর্শিতা: পূর্বসূরী ইমামগণের ব্যাখ্যা ও ফিকহি কায়দা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন।
-
তাকওয়া ও আল্লাহভীরুতা: দুনিয়াবি স্বার্থ বা লোভ তাকে প্রভাবিত করে না।
-
জামাতের স্বীকৃতি: স্থানীয় বা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত আলেমগণ তাকে যোগ্য বলে মানেন।
-
সমাজে সুনাম: সাধারণ মানুষ তার দ্বীনি সততা ও নৈতিকতা সম্পর্কে আস্থা রাখে।
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে করণীয়
আজকের দিনে তথ্য প্রযুক্তি আমাদের সামনে দ্বিমুখী দরজা খুলে দিয়েছে। একদিকে আমরা সহজেই দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করতে পারছি; অন্যদিকে অসংখ্য ভ্রান্ত মতবাদও আমাদের সামনে আসছে। তাই কয়েকটি নীতি মেনে চলা জরুরি—
-
অনলাইনে কোনো ফাতওয়া শোনার আগে বক্তার পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাই করতে হবে।
-
স্বীকৃত ইসলামী প্রতিষ্ঠান বা দারুল ইফতা কর্তৃক প্রদত্ত ফাতওয়া গ্রহণ করা নিরাপদ।
-
সন্দেহ হলে স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেমদের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে।
-
কেবলমাত্র জনপ্রিয়তা বা আবেগের কারণে কারো কথা গ্রহণ করা যাবে না।
মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব
একজন সাধারণ মুসলমানের দায়িত্ব হলো—যা জানে না, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং আল্লাহভীরু আলেমদের অনুসরণ করা। আর আলেম সমাজের দায়িত্ব হলো—অসত্য প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে সতর্ক করা, সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং সহজ ভাষায় সহিহ ফাতওয়া পৌঁছে দেওয়া।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“আল্লাহ যার জন্য কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
অতএব, দ্বীনের গভীর জ্ঞান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরই উম্মাহর পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
উপসংহার
দ্বীনি মাসআলা ও ফাতওয়া এমন একটি বিষয়, যা কখনোই অবহেলা করার নয়। কারণ এর সঙ্গে মানুষের ইমান, আমল ও আখেরাত সরাসরি সম্পর্কিত। ভুল ফাতওয়া গ্রহণ মানে ভুল পথে চলা। তাই মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেকের প্রতি আহ্বান—
“সহিহ ফাতওয়া মাসাঈল জানতে সঠিক লোকের দ্বারস্থ হনো।”
অযোগ্য, স্বার্থান্বেষী বা ভ্রান্ত ব্যক্তিদের অনুসরণ করে নিজের দুনিয়া ও আখেরাত নষ্ট করো না। বরং যোগ্য, বিশ্বস্ত ও আল্লাহভীরু আলেমদের অনুসরণ করো। তবেই ইনশাআল্লাহ তুমি নিরাপদে সঠিক পথে চলতে পারবে এবং আখেরাতে মুক্তি লাভ করবে।