মুফতি মুঈনুল ইসলাম সিলেটি
মুফতি, ফাতাওয়া ও মাসায়েল
ভূমিকা :ইসলামী শরিয়তে বিবাহ একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন। তাই কোনো নারী পূর্ববর্তী স্বামীর বিবাহবন্ধনে থাকা অবস্থায় কিংবা ইদ্দত পালনরত অবস্থায় তাকে বিবাহ করা বৈধ নয়। তবে এ ধরনের বিবাহের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিষয়টি জানত কি না, তার ওপর নিকাহে ফাসিদ ও নিকাহে বাতিলের বিধান এবং পরবর্তী ইদ্দতের হুকুমে পার্থক্য রয়েছে।
এ প্রবন্ধে অন্যের স্ত্রী ও ইদ্দতরত নারীকে বিবাহের শরয়ি বিধান, জেনে ও না জেনে এমন বিবাহের হুকুম, বিচ্ছেদ বা মুতারাকাতের প্রয়োজনীয়তা, ইদ্দতের বিধান এবং নিকাহে ফাসিদ ও বাতিলের পার্থক্য হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে আলোচনা করা হয়েছে।
১. জেনেশুনে ইদ্দতরত নারীকে বিবাহ করার বিধান।
কোন ব্যক্তি যদি জেনে শুনে এমন মহিলাকে বিবাহ করে যার এখনো ইদ্দত পরিপূর্ণ হয়নি বরং অবশিষ্ট রয়েছে তাহলে বর কনে থেকে শুরু করে যারাই এমন বিবাহের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন সবাই এমন গর্হিত হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে গুনাহগার হবেন পাশাপাশি এ বিবাহ শুদ্ধই হবে না উক্ত বিবাহের পর সহবাস হলে তা জিনা হিসেবে বিবেচিত হবে যা শাস্তির যোগ্য অপরাধ।
২. এমন বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে তালাকের প্রয়োজন হয় না।
যদি জেনেশুনে কোন ব্যক্তি এমন মহিলাকে বিবাহ করে তাহলে সেটা প্রথম থেকেই
স্পষ্ট জিনা হিসেবে গণ্য হবে বিদায়
সেখানে বিচ্ছেদের প্রয়োজন নেই বরং এমন কর্মকাণ্ড কারী ব্যক্তি কে পৃথক করে দিয়ে
শরীয়তের শাস্তি কার্যকর করায় একমাত্র সমাধান।
৩.এমন বিবাহের ইদ্দত আবশ্যক নয় ।
যেহেতু তারা জেনেশুনে এমন বিবাহে লিপ্ত হয়েছে যা হারাম ছিল বিধায় উক্ত বিবাহ বাতিল বা সম্পূর্ণ অকার্যকর হিসেবে গণ্য হবে এমন বিবাহ পরবর্তী যদি শারীরিক সম্পর্ক হয় তাহলে সেটা স্পষ্ট জিনা হিসেবে গণ্য হবে অতঃপর যখন তারা আলাদা হয়ে যাবে তখন উক্ত মহিলার উপর কোন ধরনের ইদ্দত আবশ্যক হবে না কেননা ব্যভিচারের কারণে ব্যভিচারীনি নারীর উপর ইদ্দত আবশ্যক হয়না বরং শরীয়তের নির্ধারিত শাস্তি আরোপিত হয়। এ ধরনের বিবাহকে নেকাহে বাতিল বলা হয়।
এ বিষয়ে রদ্দুল মুহতার এর বক্তব্য
، أما نكاح منكوحة الغير ومعتدته فالدخول فيه لا يوجب العدة إن علم أنها للغير لأنه لم يقل أحد بجوازه فلم ينعقد أصلاً، فعلى هذا يفرق بين فاسده وباطله في العدة، ولهذا يجب الحد مع العلم بالحرمة لكونها زنا كما في القنية وغيرها اهـ .
আর অন্যের স্ত্রী অথবা ইদ্দত পালনরত কোনো নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তি জানে যে ঐ নারী অন্যের স্ত্রী কিংবা ইদ্দত পালনরত তাহলে তার সঙ্গে সহবাস করলেও কোনো ইদ্দত আবশ্যক হবে না। কারণ এ ধরনের বিবাহের বৈধতার পক্ষে কোনো আলেম মত দেননি। তাই মূলত এ বিবাহ শুরু থেকেই সংঘটিত বা কার্যকর হয়নি।
সুতরাং এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) ও বাতিল (সম্পূর্ণ অকার্যকর) বিবাহের মধ্যে ইদ্দতের বিধানের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।
আর এ কারণেই যদি সে জেনেশুনে এই নিষিদ্ধ নারীর সঙ্গে সহবাস করে তাহলে তার ওপর হদ্দের শাস্তি প্রযোজ্য হবে কারণ এটি ব্যভিচার (জিনা) হিসেবে গণ্য হবে যেমন আল কুনইয়া প্রভৃতি কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
( রদ্দুল মুহতার ৫/১৯৯/ আযহার)
৪. না জেনে ইদ্দতরত নারীকে বিবাহ করার বিধান।
আর যদি না জেনে ইদ্দত পালনরত মহিলাকে বিবাহ করে তাহলেও উক্ত বিবাহ শুদ্ধ হবে না তবে না জেনে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে সে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গুনাগার হবে না। তবে জানার সাথে সাথে পৃথক হয়ে যাবে । এ ধরনের বিবাহকে নেকাহে ফাসিদ বলা হয়।
৫. এ ধরনের বিবাহে মোতারাকাত - ছাড়াছাড়ি আবশ্যক।
যেহেতু ইদ্দত অবশিষ্ট থাকার বিষয় না জেনে শুনে এমন বিবাহ হয়েছে বিধায় এমন বিবাহের ক্ষেত্রে মুতারাকাত অবশ্যক তথা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হওয়া জরুরী সেটা হয়তো কাজীর মাধ্যমে হবে স্বামী স্ত্রীকে এমন শব্দ বলবে যার দ্বারা বিবাহ বিচ্ছেদ বুঝায় যেমন আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম অথবা তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে সম্পর্ক বিচ্ছেদ ঘটাবে অথবা এক তালাক দিয়ে দিবে । যেহেতু এই বিবাহে সহবাস হয়েছে হালাল মনে করে বিধায় যথা নিয়মে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর পাশাপাশি ইদ্দত ও আবশ্যক হবে এটাই শরিয়াতের বিধান।
নিম্নে আদ্দুররুল মুখতার এর বক্তব্য পেশ করা হলো
(غير الآيسة والحامل) فإن عدتهما بالأشهر والوضع الحيض للموت) أي : موت الواطىء (وغيره) كفرقة أو متاركة،.................. المتاركة أي : (إظهار العزم من الزوج (على ترك وطئها بأن يقول بلسانه : تركتك بلا وطء ونحوه، ومنه الطلاق
যে নারীর মাসিক সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে ও গর্ভবতী নারী ব্যতীত অন্যান্য নারীর ইদ্দত মাসিকের মাধ্যমে গণনা করা হয়। স্বামীর মৃত্যু ঘটলেও যদি নারী গর্ভবতী বা আয়ীছা না হয় তার ইদ্দত মাসিক দ্বারাই হবে। পক্ষান্তরে স্বামীর মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো কারণে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান হলে যেমন বিচ্ছেদ বা পরিত্যাগের ক্ষেত্রে তার বিধান ভিন্ন।
মুতারাকাহ (متاركة) বলা হয় স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস না করার এবং তাকে পরিত্যাগ করার ব্যাপারে নিজের দৃঢ় সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা। যেমন স্বামী মুখে বলে আমি তোমার সাথে আর সহবাস করব না তোমাকে ছেড়ে দিলাম এ ধরনের কথা বলা। তালাকও এর অন্তর্ভুক্ত।
(আদ্দুরুল মুখতার ৫/২০২/ আযহার)
৬. এমন বিবাহে ইদ্দত আবশ্যক হবে।
এমন নারীর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক এবং তা তিন হায়েজ (মাসিক)। তবে সে যদি এমন নারী হয় যার মাসিক হয় না তাহলে তার ইদ্দত মাসের হিসাবে হবে। আর গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসবের মাধ্যমে ইদ্দত শেষ হবে।
রদ্দুল মোহতার এর বক্তব্য পেশ করা হলো
عدة المذكورات ثلاث حيض إن كن من
ذوات الحيض، وإلا فالأشهر أو وضع الحمل، وهذا إن كانت المنكوحة نكاحاً فاسداً أو
الموطوءة بشبهة حرة إذ للأمة حيضتان
উল্লিখিত নারীদের ইদ্দত তিন হায়েজ (মাসিক)। তবে তারা যদি এমন নারী হয় যাদের মাসিক হয় না তাহলে তাদের ইদ্দত মাসের হিসাবে হবে। আর গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসবের মাধ্যমে ইদ্দত শেষ হবে।
এ বিধান তখন প্রযোজ্য যখন নারী কোনো ফাসেদ নিকাহের মাধ্যমে বিবাহিত হয়েছে অথবা কোনো সন্দেহজনক সম্পর্কের (وطءبشبهة) করণে তার উপর ইদ্দত আবশ্যক হয়েছে এবং সে স্বাধীন নারী (হুররা) হয়। কারণ দাসী নারীর ইদ্দত দুই হায়েজ।
৭. জেনেশুনে অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ করার বিধান।
কোন ব্যক্তি যদি জেনেশুনে অন্যের বিবাহিতা স্ত্রীকে পালিয়ে বা যেকোনোভাবে বিবাহ করে তাহলে এমন বিবাহ শুদ্ধ হয় না বরং তা বাতিল হিসেবে গণ্য হয় এবং এমন হারাম কাজের সাথে জড়িত সবাই গুনাগার হবে কেননা সেটা স্পষ্ট ব্যভিচারের অন্তর্ভুক্ত যা ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না এক্ষেত্রে তাদের উপর আবশ্যক হলো স্বামী স্ত্রী পৃথক হওয়ার পাশাপাশি যথাসম্ভব নিজের কৃতকর্মের উপর অনুতপ্ত হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে প্রার্থনা করা। এ ব্যাপারে ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়ার বর্ণনা নিম্নে পেশ করা হল
ولا يجوز نكاح منكوحة الغير ومعتدة الغير عند الكل، ولو تزوج بمنكوحة الغير وهو لا يعلم أنها منكوحة الغير فوطئها تجب العدة، وإن كان يعلم أنها منكوحة الغير فوطئها لا تجب العدة حتى لا يحرم على الزوج وطؤها
.অন্যের স্ত্রী এবং অন্যের ইদ্দত পালনরত নারীকে বিবাহ করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ নয়।
তবে কেউ যদি না জেনে এমন কোনো নারীকে বিবাহ করে ফেলে যে ইতিপূর্বে অন্য ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এরপর তার সঙ্গে সহবাস করে তাহলে ঐ নারীর উপর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক হবে।আর যদি সে জেনেশুনে অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ করে এবং তার সঙ্গে সহবাসও করে তাহলে তার উপর ইদ্দত আবশ্যক হবে না। ফলে তার আসল স্বামীর জন্য ঐনারীর সঙ্গে সহবাস করা হারাম হবে না।(ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া ২/২৭৬/ ইলমিয়্যাহ)
এ বিষয়ে রদ্দুল মুহতার এর বক্তব্য
، أما نكاح منكوحة الغير ومعتدته فالدخول فيه لا يوجب العدة إن علم أنها للغير لأنه لم يقل أحد بجوازه فلم ينعقد أصلاً، فعلى هذا يفرق بين فاسده وباطله في العدة، ولهذا يجب الحد مع العلم بالحرمة لكونها زنا كما في القنية وغيرها اهـ .
আর অন্যের স্ত্রী অথবা ইদ্দত পালনরত কোনো নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তি জানে যে ঐ নারী অন্যের স্ত্রী কিংবা ইদ্দত পালনরত তাহলে তার সঙ্গে সহবাস করলেও কোনো ইদ্দত আবশ্যক হবে না। কারণ এ ধরনের বিবাহের বৈধতার পক্ষে কোনো আলেম মত দেননি। তাই মূলত এ বিবাহ শুরু থেকেই সংঘটিত বা কার্যকর হয়নি।
সুতরাং এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) ও বাতিল (সম্পূর্ণ অকার্যকর) বিবাহের মধ্যে ইদ্দতের বিধানের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।আর এ কারণেই যদি সে জেনেশুনে এই নিষিদ্ধ নারীর সঙ্গে সহবাস করে তাহলে তার উপর হদের শাস্তি প্রযোজ্য হবে কারণ এটি ব্যভিচার (জিনা) হিসেবে গণ্য হবে যেমন আল কুনইয়া প্রভৃতি কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
( রদ্দুল মুহতার ৫/১৯৯/ আযহার)
৮. এমন বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে তালাকের প্রয়োজন হয় না।
যদি জেনেশুনে কোন ব্যক্তি এমন মহিলাকে বিবাহ করে তাহলে সেটা প্রথম থেকেই স্পষ্ট জিনা হিসেবে গণ্য হবে বিধায় সেখানে বিচ্ছেদের প্রয়োজন নেই বরং এমন কর্মকাণ্ডকারী ব্যক্তিকে পৃথক করে দিয়ে শরীয়তের শাস্তি কার্যকর করা একমাত্র সমাধান।
৯. এমন বিবাহের ইদ্দত আবশ্যক নয় ।
যেহেতু তারা জেনেশুনে এমন বিবাহে লিপ্ত হয়েছে যা হারাম ছিল বিধায় উক্ত বিবাহ বাতিল বা সম্পূর্ণ অকার্যকর হিসেবে গণ্য হবে এমন বিবাহ পরবর্তী যদি শারীরিক সম্পর্ক হয় তাহলে সেটা স্পষ্ট জিনা হিসেবে গণ্য হবে অতঃপর যখন তারা আলাদা হয়ে যাবে তখন উক্ত মহিলার উপর কোন ধরনের ইদ্দত আবশ্যক হবে না কেননা ব্যভিচারের কারণে ব্যভিচারীনি নারীর উপর ইদ্দত আবশ্যক হয়না বরং শরীয়তের নির্ধারিত শাস্তি আরোপিত হয়। এ ধরনের বিবাহকে নিকাহে বাতিল বলা হয়। এ ব্যাপারে ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়ার বর্ণনা নিম্নে পেশ করা হল
ولا يجوز نكاح منكوحة الغير ومعتدة الغير عند الكل، ولو تزوج بمنكوحة الغير وهو لا يعلم أنها منكوحة الغير فوطئها تجب العدة، وإن كان يعلم أنها منكوحة الغير فوطئها لا تجب العدة حتى لا يحرم على الزوج وطؤها
.অন্যের স্ত্রী এবং অন্যের ইদ্দত পালনরত নারীকে বিবাহ করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ নয়।তবে কেউ যদি না জেনে এমন কোনো নারীকে বিবাহ করে ফেলে যে ইতিপূর্বে অন্য ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এরপর তার সঙ্গে সহবাস করে তাহলে ঐ নারীর উপর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক হবে।আর যদি সে জেনেশুনে অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ করে এবং তার সঙ্গে সহবাসও করে তাহলে তার উপর ইদ্দত আবশ্যক হবে না। ফলে তার আসল স্বামীর জন্য ঐ নারীর সঙ্গে সহবাস করা হারাম হবে না।(ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া ২/২৭৬/ ইলমিয়্যাহ)
এ বিষয়ে রদ্দুল মুহতার এর বক্তব্য
، أما نكاح منكوحة الغير ومعتدته فالدخول فيه لا يوجب العدة إن علم أنها للغير لأنه لم يقل أحد بجوازه فلم ينعقد أصلاً، فعلى هذا يفرق بين فاسده وباطله في العدة، ولهذا يجب الحد مع العلم بالحرمة لكونها زنا كما في القنية وغيرها اهـ .
আর অন্যের স্ত্রী অথবা ইদ্দত পালনরত কোনো নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তি জানে যে ঐ নারী অন্যের স্ত্রী কিংবা ইদ্দত পালনরত তাহলে তার সঙ্গে সহবাস করলেও কোনো ইদ্দত আবশ্যক হবে না। কারণ এ ধরনের বিবাহের বৈধতার পক্ষে কোনো আলেম মত দেননি। তাই মূলত এ বিবাহ শুরু থেকেই সংঘটিত বা কার্যকর হয়নি।
সুতরাং এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) ও বাতিল (সম্পূর্ণ অকার্যকর) বিবাহের মধ্যে ইদ্দতের বিধানের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।আর এ কারণেই যদি সে জেনেশুনে এই নিষিদ্ধ নারীর সঙ্গে সহবাস করে তাহলে তার উপর হদের শাস্তি প্রযোজ্য হবে কারণ এটি ব্যভিচার (জিনা) হিসেবে গণ্য হবে যেমন আল কুনইয়া প্রভৃতি কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
( রদ্দুল মুহতার ৫/১৯৯/ আযহার)
১০. না জেনে অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ করার বিধান।
আর যদি না জেনে শুনে অন্যের বিবাহিত স্ত্রীকে বিবাহ করে যেমন অন্যের বিবাহিত স্ত্রীকে না জেনে পালিয়ে বিয়ে করে তাহলেও এমন বিবাহ শুদ্ধ হবে না তবে না জেনে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে সে গুনাগার হবে না তার জন্য করণীয় হলো জানার সাথে সাথে পৃথক হয়ে যাওয়া এবং অজানিত এ গুনাহের কারণে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ ধরনের বিবাহকে নিকাহে ফাসিত বলা হয়।
১১. এমন বিবাহের ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ জরুরি।
যদিও সে অন্যের স্ত্রী তথাপি না জেনে এমন মহিলার সাথে বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার কারণে উক্ত বিবাহ ফাসিদ হিসেবে গণ্য হবে এমন বিবাহের ক্ষেত্রে মুতারাকাত অবশ্যক তথা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হওয়া জরুরী সেটা হয়তো কাজীর মাধ্যমে হবে স্বামী স্ত্রীকে এমন শব্দ বলবে যার দ্বারা বিবাহ বিচ্ছেদ বুঝায় যেমন আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম অথবা তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে সম্পর্ক বিচ্ছেদ ঘটাবে অথবা এক তালাক দিয়ে দিবে ।নিম্নে আদ্দুররুল মুখতার এর বক্তব্য পেশ করা হলো
(غير الآيسة والحامل) فإن عدتهما بالأشهر والوضع الحيض للموت) أي : موت الواطىء (وغيره) كفرقة أو متاركة،.................. المتاركة أي : (إظهار العزم من الزوج (على ترك وطئها بأن يقول بلسانه : تركتك بلا وطء ونحوه، ومنه الطلاق
যে নারীর মাসিক সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে ও গর্ভবতী নারী ব্যতীত অন্যান্য নারীর ইদ্দত মাসিকের মাধ্যমে গণনা করা হয়। স্বামীর মৃত্যু ঘটলেও যদি নারী গর্ভবতী বা আয়ীছা না হয় তার ইদ্দত মাসিক দ্বারাই হবে। পক্ষান্তরে স্বামীর মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো কারণে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান হলে যেমন বিচ্ছেদ বা পরিত্যাগের ক্ষেত্রে তার বিধান ভিন্ন।
মুতারাকাহ (متاركة) বলা হয় স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস না করার এবং তাকে পরিত্যাগ করার ব্যাপারে নিজের দৃঢ় সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা। যেমন স্বামী মুখে বলে আমি তোমার সাথে আর সহবাস করব না তোমাকে ছেড়ে দিলাম এ ধরনের কথা বলা। তালাকও এর অন্তর্ভুক্ত।
(আদ্দুরুল মুখতার ৫/২০২/ আযহার)
১২. এমন বিবাহে ইদ্দত আবশ্যক হবে।
এমন নারীর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক এবং তা তিন হায়েজ (মাসিক)। তবে সে যদি এমন নারী হয় যার মাসিক হয় না তাহলে তার ইদ্দত মাসের হিসাবে হবে। আর গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসবের মাধ্যমে ইদ্দত শেষ হবে।
এ ব্যাপারে ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়ার বর্ণনা নিম্নে পেশ করা হল
ولا يجوز نكاح منكوحة الغير ومعتدة الغير عند الكل، ولو تزوج بمنكوحة الغير وهو لا يعلم أنها منكوحة الغير فوطئها تجب العدة، وإن كان يعلم أنها منكوحة الغير فوطئها لا تجب العدة حتى لا يحرم على الزوج وطؤها
.অন্যের স্ত্রী এবং অন্যের ইদ্দত পালনরত নারীকে বিবাহ করা সর্বসম্মতভাবে বৈধ নয়।তবে কেউ যদি না জেনে এমন কোনো নারীকে বিবাহ করে ফেলে যে ইতিপূর্বে অন্য ব্যক্তির স্ত্রী ছিল এরপর তার সঙ্গে সহবাস করে তাহলে ঐ নারীর উপর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক হবে।আর যদি সে জেনেশুনে অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ করে এবং তার সঙ্গে সহবাসও করে তাহলে তার উপর ইদ্দত আবশ্যক হবে না। ফলে তার আসল স্বামীর জন্য ঐ নারীর সঙ্গে সহবাস করা হারাম হবে না।(ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া ২/২৭৬/ ইলমিয়্যাহ)
রদ্দুল মোহতার এর বক্তব্য পেশ করা হলো
عدة المذكورات ثلاث حيض إن كن من ذوات الحيض، وإلا فالأشهر أو وضع الحمل، وهذا إن كانت المنكوحة نكاحاً فاسداً أو الموطوءة بشبهة حرة إذ للأمة حيضتان
উল্লিখিত নারীদের ইদ্দত তিন হায়েজ (মাসিক)। তবে তারা যদি এমন নারী হন যাদের মাসিক হয় না তাহলে তাদের ইদ্দত মাসের হিসাবে হবে। আর গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসবের মাধ্যমে ইদ্দত শেষ হবে।
এ বিধান তখন প্রযোজ্য যখন নারী কোনো ফাসেদ নিকাহের মাধ্যমে বিবাহিত হয়েছে অথবা কোনো সন্দেহজনক সম্পর্কের (وطءبشبهة) কারণে তার ওপর ইদ্দত আবশ্যক হয়েছে এবং সে স্বাধীন নারী (হুররা) হয়। কারণ দাসী নারীর ইদ্দত দুই হায়েজ।(রদ্দুল মুহতার৫/২০২/ আযহার)
১৩.নিকাহে ফাসিদ এবং বাতিলের মধ্যে পার্থক্য।
মৌলিকভাবে বিবাহ অবৈধ হওয়ার বিবেচনায় নিকাহে ফাসিদ এবং বাতিলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই অর্থাৎ নিকাহে ফাসিদ এবং বাতিল উভয়ের হুকুম এক ও অভিন্ন দুই পদ্ধতির যেকোনো পদ্ধতিতে বিবাহ হলে এমন বিবাহ শুদ্ধ হবে না বরং এভাবে বলা যায় যে উক্ত বিবাহ সংগঠিতই হবে না। তবে ইদ্দতের ক্ষেত্রে নিকাহে ফাসিদ এবং বাতিলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে আর সেটা হলো নিকাহে ফাসিদের ক্ষেত্রে ইদ্দত আবশ্যক হয় কিন্তু বাতিলের ক্ষেত্রে ইদ্দত অবশ্যক হয় না। যদি কোন ব্যক্তি জেনেশুনে ইদ্দত পালনরত মহিলা অথবা অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ করে তাহলে উক্ত বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে এমন মহিলা বিবাহ করা তার জন্য হারাম হিসেবে গণ্য হবে তাহলে এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে উক্ত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় হারামে লিপ্ত হল আবার যদি সহবাস করে তাহলে সেটি স্পষ্ট জিনা হিসেবে গণ্য হবে আর ব্যভিচার করলে ব্যাবিচারিনী মহিলার উপরের ইদ্দত অবশ্যক হয় না বিধায় নিকাহে বাতিলের ক্ষেত্রে ইদ্দত আবশ্যক হবে না। আর যদি না জেনে ইদ্দত পালনরত মহিলাকে বিবাহ করে অথবা না জেনে অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ করে তাহলে উক্ত বিবাহকে নিকাহে ফাসিদ বলে এমন বিবাহের পর সহবাস হলে ইদ্দত পালন করা আবশ্যক হয়ে যায় কেননা সে তো জানতোই না উক্ত মহিলার ইদ্দত শেষ না হওয়ার ব্যাপারে অথবা উক্ত মহিলা যে অন্যের স্ত্রী সেটাও জানা ছিল না তার বিধায় সে হালাল জেনে বিবাহ করেছে এবং সহবাস ও করেছে ফলে জানার পর পৃথক হওয়ার সাথে সাথে উক্ত মহিলার উপর ইদ্দত আবশ্যক হবে। তবে নিকাহে ফাসিদের ক্ষেত্রেও সহবাস না হলে ইদ্দত আবশ্যক হবে না। এ বিষয়ে রদ্দুল মুহতার এর বক্তব্য
، أما نكاح منكوحة الغير ومعتدته فالدخول فيه لا يوجب العدة إن علم أنها للغير لأنه لم يقل أحد بجوازه فلم ينعقد أصلاً، فعلى هذا يفرق بين فاسده وباطله في العدة، ولهذا يجب الحد مع العلم بالحرمة لكونها زنا كما في القنية وغيرها اهـ .
আর অন্যের স্ত্রী অথবা ইদ্দত পালনরত কোনো নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তি জানে যে ঐ নারী অন্যের স্ত্রী কিংবা ইদ্দত পালনরত তাহলে তার সঙ্গে সহবাস করলেও কোনো ইদ্দত আবশ্যক হবে না। কারণ এ ধরনের বিবাহের বৈধতার পক্ষে কোনো আলেম মত দেননি। তাই মূলত এ বিবাহ শুরু থেকেই সংঘটিত বা কার্যকর হয়নি।
সুতরাং এ দৃষ্টিকোণ থেকে ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) ও বাতিল (সম্পূর্ণ অকার্যকর) বিবাহের মধ্যে ইদ্দতের বিধানের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।( রদ্দুল মুহতার ৫/১৯৯/ আযহার) আদ্দুরুল মুখতার গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে
(وعدة المنكوحة نكاحاً فاسداً) فلا عدة في باطل
ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) বিবাহে বিবাহিত নারীর ওপর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক হবে। তবে বাতিল বিবাহের ক্ষেত্রে ইদ্দত নেই।অর্থাৎ নিকাহ যদি শরিয়তের দৃষ্টিতে ফাসিদ হয় এবং সহবাস হয়ে থাকে তাহলে ইদ্দত আবশ্যক হবে কিন্তু নিকাহ যদি বাতিল হয় তাহলে শুধু সেই বাতিল নিকাহের কারণে ইদ্দত আবশ্যক হবে না। ( আদ্দুরুল মুখতার ৫/১৯৯/আযহার)
قوله : (فلا عدة في باطل) فيه أن لا فرق بين الفاسد والباطل في النكاح، بخلاف البيع
লেখকের কথা: বাতিল বিবাহের ক্ষেত্রে ইদ্দত নেই এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে বিবাহের ক্ষেত্রে ফাসিদ ও বাতিল এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ফাসিদ ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।অতএব বিবাহ অবৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে ফাসিদ এবং বাতিলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই তবে ইদ্দত আবশ্যক হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে পার্থক্য রয়েছে নিকাহে বাতিলের ক্ষেত্রে ইদ্দত নেই আর ফাসিদের ক্ষেত্রে ইদ্দত আবশ্যক।
উপসংহার : উপরোক্ত আলোচনা ও ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের উদ্ধৃতি থেকে প্রতীয়মান হয় যে অন্যের স্ত্রী কিংবা ইদ্দতরত নারীকে বিবাহ করা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। তবে বিবাহকারী ব্যক্তি ঐ নারী অন্যের স্ত্রী বা ইদ্দতরত এ বিষয়টি জানত কি না তার ওপর পরবর্তী কিছু শরয়ি বিধানের পার্থক্য নির্ভর করে।যদি কোনো ব্যক্তি জেনেশুনে অন্যের স্ত্রী অথবা ইদ্দতরত নারীকে বিবাহ করে তাহলে এ বিবাহ শরিয়তের দৃষ্টিতে নিকাহে বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। এ বিবাহের দ্বারা কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে না। অতএব এ ক্ষেত্রে তালাকের প্রয়োজন নেই বরং তাদেরকে পৃথক করে দেওয়াই যথেষ্ট। আর জেনেশুনে এমন নিষিদ্ধ নারীর সঙ্গে সহবাস করলে তা শরয়ি দৃষ্টিতে জিনা হিসেবে গণ্য হবে এবং এ ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্ধারিত শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হবে। এ অবস্থায় শুধু ঐ বাতিল নিকাহের কারণে নারীর ওপর ইদ্দতও আবশ্যক হবে না।অন্যদিকে যদি কোনো ব্যক্তি না জেনে অন্যের স্ত্রী অথবা ইদ্দতরত নারীকে বিবাহ করে এবং পরবর্তীতে বিষয়টি জানতে পারে তাহলে বিবাহটি বৈধ না হলেও তা নিকাহে ফাসিদ হিসেবে গণ্য হবে। বিষয়টি জানা মাত্র স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মুতারাকাত (متاركة) অর্থাৎ বিচ্ছেদ ঘটানো জরুরি হবে। আর যদি এ ফাসিদ নিকাহের পর সহবাস হয়ে থাকে তাহলে নারীর উপর ইদ্দত পালন করাও আবশ্যক হবে। সাধারণ স্বাধীন নারীর ক্ষেত্রে তা তিন হায়েজ যাদের হায়েজ হয় না তাদের ক্ষেত্রে তিন মাস এবং গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসবের মাধ্যমে ইদ্দত পূর্ণ হবে।সুতরাং মূল কথা হলো নিকাহে ফাসিদ ও নিকাহে বাতিল উভয়ই বৈধ বিবাহ নয় এবং উভয়ের দ্বারাই বৈবাহিক সম্পর্ক মৌলিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না তবে সহবাসের পর ইদ্দতের বিধানের ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফাসিদ নিকাহের পর সহবাস হলে ইদ্দত আবশ্যক হয় পক্ষান্তরে বাতিল নিকাহের ক্ষেত্রে ইদ্দত আবশ্যক হয় না। এ পার্থক্যই হানাফি ফিকহে এ দুই পরিভাষার ব্যবহারিক গুরুত্বপূর্ণ দিক।অতএব কোনো নারীর পূর্ববর্তী বৈবাহিক সম্পর্ক বা ইদ্দত শেষ হয়েছে কি না এ বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে বিবাহে আবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। বিবাহের পূর্বে এ বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। আর যদি ভুলবশত এমন বিবাহ সংঘটিত হয়ে যায় তাহলে বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ইদ্দতসহ সংশ্লিষ্ট বিধান যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
মুফতি ,সম্মিলিত ফতোয়া বিভাগ ,মাহাদুল ফিকহিল ইসলামী বাংলাদেশ
মুশরিফ,( ইফতা বিভাগ) মারকাযুদ দাওয়াহ ওয়াল ইরশাদ, দক্ষিণখান, ঢাকা